উন্নয়ন মহাকাশে, খাবার চেয়ে জীবন পিষ্ট পায়ের তলে

0
7

আরবিএন রিপোর্ট

আকাশে মেঘ না থাকলে গ্রীষ্মের দুপুরে রাজধানীর জনজীবন ওষ্ঠাগত। কংক্রিটের নগরে পিচঢালা সড়ক আর সিসামাখা বাতাসে প্রাণের স্পন্দন থেমে যায় প্রায়। সোমবারও গ্রীষ্মের তেজের হেরফের ছিল না।

রাজধানীর প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে সূর্য তখন একেবারে মাথার ওপর। মেইন গেট ঘেঁষেই সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। বৃষ্টি ভেজা ইটের সুরকি আর কাদামাটি সড়কের মধ্যখানেও এসে ঠেকেছে। ভেজা মাটির ওপরেই তিনজন তরুণ ‘যৌনসন্ত্রাস বন্ধ করুন’ এমন দাবিতে ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছেন। আর সড়কের উত্তর পাশে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবিতে মানববন্ধন করছে একটি বাম সংগঠন।

মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের লাইন শেষ হয়েছে ফুটওভার ব্রিজের নিচে গিয়ে। ফুটওভার ব্রিজের পূর্বপাশে একটি ট্রাকে থরে থরে চাল, ডাল, তেলসহ নানা পণ্য সাজানো। ট্রাকের ওপরে পলিথিনের ছাউনি। সরকারি উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে জনসাধারণের মাঝে।

নারী-পুরুষের আলাদা লাইন, তবে তা নাতিদীর্ঘ। যারা ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়েছেন, তাদের অনেকেই জীবনযুদ্ধে যে প্রায় পরাজিত, তা চোখমুখ দেখেই ঠাহর করা যাচ্ছে। অনেকেই রোদ থেকে রক্ষা পেতে ভাঁজ করা ব্যাগ মাথার উপরে ধরে রেখেছেন।

তবে পুরুষের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী একজন ব্যাগ দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন যেন। রোদের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন বটে, তবুও মুখের কাছে ব্যাগ ধরে রহস্যময় চাহনি ফেলছেন এদিক-ওদিক। বয়স পঞ্চাশ ছুঁয়েছে হয়ত। ছেঁটে রাখা গোঁফ আধা-কাঁচা। টাক মাথায় যে কয় গোছা চুল আছে, তাতেও পাক ধরেছে। প্যান্টের নিচে গুঁজে রাখা শার্ট লাইনে দাঁড়ানোর আগে যে খুলে ফেলেছেন, তা ভাঁজ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

মোটরবাইক থামিয়ে কথা হয়, দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী নাদিম হাওলাদারের সঙ্গে। চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বিশ বছর কেটে গেছে ঢাকার জীবন। চার ছেলেমেয়ের কেউ ভার্সিটি পড়ছেন, কেউ স্কুল-কলেজে।

লজ্জা আর ইতস্তত ভঙ্গিতে বলেন, ‘আর পারছি না। বাজারে গেলে মাসের হিসেব মেলে না। রোজা আসছে। চোখে সরষে ফুল দেখছি। ছেলেদের আসতে বলেছিলাম লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে। লজ্জায় আসতে চায় না ওরা। অফিস থেকে খানিক সময়ের জন্য ছুটি নিয়ে নিজেই এসেছি।’ ছবি তুলতে চাইলে লজ্জায় মাথা নিচু করলেন। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করারও আর স্বাদ জাগল না।

বাইকে উঠতে গিয়ে চোখ পড়ল ফুটওভার ব্রিজে। তাতে স্যাটেলাইট জগতে বাংলাদেশের প্রবেশে স্বাগত জানিয়ে নানা ব্যানার সাঁটানো। প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে তথ্যমন্ত্রণালয়ও ব্যানার সাঁটিয়েছে।

বিকেলে অফিসে এসে কম্পিউটারের স্ক্রিনে নিউজ পোর্টালে চোখ রেখে দেখলাম, স্যাটেলাইট আনন্দে ভাসছে দেশ। বিভিন্ন জেলা থেকে আনন্দ মিছিলের খবর আসছে তখনও। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন মহাকাশে এবং তার আনন্দ গোটা দেশে- এমন খবরগুলো দেখে আনন্দধারায় মন ভরে উঠছিল।

ততক্ষণে অবশ্য চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় জাকাতের কাপড় ও ইফতারসামগ্রী নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১০ নারীর মৃত্যুর খবরটি ফিকে হয়ে আসছিল।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here