কোন সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন?

0
449

অলিউল্লাহ নোমান
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সব সময়ই উত্তপ্ত হয় রাজনীতির মাঠ। জাতীয় ফুটবল লীগের খেলোয়াড়দের দল বদলের মত রাজনীতিকরাও দলীয় পতাকা পরিবর্তন করতে দেখা যেত নির্বাচন সামনে রেখে। পাশাপাশি উড়ে এসে জুড়ে বসার মত ঘটনাও ঘটে। অনেক বড় রাজনীতিকের আসনের টিকেট ছো মেরে নিয়ে নেন টাকাওয়ালা কোন ব্যবসায়ী। এরকম অনেক ঘটনাই দেখা গেছে অতীতে। যেমন ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে বিএনপি’র বড় নেতা মাহবুবুল আলম তারা যোগ দেন আওয়ামী লীগে। যিনি ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের সংসদে সরকারের হুইপ ছিলেন। তাঁর আসনে অন্য একজন ব্যবসায়ী দখলে নেয়ার পর মনোনয়ন বঞ্চিত হন তিনি। দল ছাড়েন। যোগ দেন আওয়ামী লীগে। এমনই দেখা গেছে নোয়াখালির এক আসনে বড় নেতা বরকত উল্লাহ বুলুকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন পেলেন পারটেক্স গ্রুপের আবুল হাসেম। যাকে কখনো রাজনীতিতে দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগেও এরকম অনেক ঘটনা রয়েছে। ঢাকার একটি আসনে মোজাফ্ফর হোসেন পল্টুর মত রাজনীতিককে বাদ দিয়ে ১৯৯৬ সালে মনোনয়ন দেওয়া হয় ব্যবসায়ী সাবের হোসেন চৌধুরীকে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগর প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. আলাউদ্দিন কাঙ্খিত মনোনয়ন না পেয়ে যোগ দিয়েছিলেন বিএনপিতে। দল বদলের নানা ঘটনা, উড়ে এসে ছো মেরে মনোনয়ন নিয়ে যাওয়ার নজির কম নেই অতীতে। আগামী নির্বাচনে কি ঘটবে সেটা দেখা যাবে তফসিল ঘোষনার পর।

১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের মত রাজনীতির পরিবেশ এখন বিরাজমান নেই। সুতরাং আগামী নির্বাচন নিয়ে এখনো নানা শঙ্কা বিরাজমান। ২০ দলীয় জোট ২০১২ সাল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলন করছে। তত্ত্বাবধায়ক দাবী না মানায় ২০ দলীয় জোটসহ আরো অনেক রাজনৈতিক দল ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করেছিল। নির্বাচনের ৩ মাস আগে থেকে আন্দোলন কর্মসূচিতে দেশ ছিল অচল। এবার যদিও আন্দোলন কর্মসূচি তেমন নেই তবে রাজনীতিতে ঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে। ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি গঠিত হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। শোনা যাচ্ছে নির্দলীয় সরকারের দাবীতে তারা আন্দোলনের চক তৈরি করছে। এদিকে সরকার বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের জন্য চুড়ান্ত প্রস্তুুতি এগিয়ে নিচ্ছে।

নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কি পারবে দাবী আদায় করতে:

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচনের জন্য সরকারের কাছে দাবী পেশ করেছে। ৭ দফা দাবীর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, সেনা মোতায়েনসহ বিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবীও ৭ দফার অন্তর্ভুক্ত। এখন দেখার বিষয় এই দাবী গুলো আদায়ে সরকারকে কাবু করতে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের কর্মসূচির ধার কতটা শক্তিশালী হয়।

একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ১৯৯৬ সালের বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুত্ক করেছিল। তখন এই দাবীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে। বিএনপি রীতিমত তখন একঘরে হয়ে পড়েছিল রাজনীতির ময়দানে। ১৭৩ দিন হরতাল অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও, ভাংচুর থেকে শুরু করে হেন কর্মসূচি নেই যা তখন পালিত হয়নি। রীতিমত বেকায়দায় পড়েই বিএনপি তখন এই দাবী মানতে বাধ্য হয়। তারপরও পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি ১১৬ আসলে বিজয়ী হয়েছিল!

এবার নির্বাচনের বাকী আর মাত্র ৩ মাস। এই ৩ মাসের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করা লাগবে। সাংবিধানিক বাধ্যবাদকতা অনুযায়ী এর মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এই ৩ মাসে নির্বাচনের আগে কি দাবী আদায় সম্ভব হবে! এর উত্তর পাওয়া যাবে জাতীয় ঐক ফ্রন্টের কর্মসূচি দেখার পর। এখনো তাদের চুড়ান্ত কোন কর্মসূচি ঘোষিত হয়নি।

দাবী আদায় না হলে কি হবে তখন:
দাবীয় আদায় হলে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। তখন লেভেল প্লেইং ফিল্ডে নির্বাচনী লড়াই হবে। মানুষ নির্বিঘেœ ভোট দিতে যাবে। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে। কিন্তু, দাবী আদায় না হলে সেই সুযোগের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীন। তখন কি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট! সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেই দিয়েছেন নির্বাচনের সময় মন্ত্রিসভাও পরিবর্তন হবে না। বিদ্যমান মন্ত্রিসভায় বহাল থাকবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদায় করতে না পারলে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া কোন গতি থাকবে না। হ্যা, একটি পথ রয়েছে নির্বাচন বর্জন করা। নবগঠিত এই জোট কি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর মত শেখ হাসিনাকে আরেকটি ওয়াকওভার দেবে! এমন নানা প্রশ্ন রয়েছে মানুষের মনে।

অসুন দেখে নেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতার সর্বশেষ বিবৃতিটি। সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ড. কামালের উদ্বেগ শিরোনামে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে দৈনিক মানবজমিন অনলাইন। এই বিবৃতির ভাষা অনেকটা ইঙ্গিপূর্ণ। এতে বলা হয় ‘মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দলসমূহকে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য আমি এবং অপরাপর সহকর্মীরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছি, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চিন্তার অনুকূল।’

বিবৃতিতে তাঁর এই ভাষা থেকেই অনুমান করা যায় আগামীতে কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিবে কি নিবে না!

বিএনপি’র কি নির্বাচনী প্রস্তুতি রয়েছে:
সংশ্লিষ্ট সূত্র গুলো থেকে আভাস পাওয়া যায়, বিএনপিও নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই দলটি এখন নির্বাচনে যেতে চায়। তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ওয়াকওভার দিতে নাজরাজ। বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড় দিতে রাজি নয় বিএনপি। দলীয় সূত্র গুলো বলছে, আগামী নির্বাচনে যাতে বিএনপি অংশ না নেয় শেখ হাসিনা সেটাই চাচ্ছে এবং সেই পথেই ঠেলে দিতে চায়। তাই শেখ হাসিনার কোন ফাঁদে তারা পা দিতে রাজি নয়। বরং নির্বাচনে অংশ নিয়ে শেখ হাসিনাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চায়। সে লক্ষ্যেই দলটি এখন সব প্রস্তুতি চুড়ান্ত করছে।

কিছুদিন আগেও যাদের মুখে শোনা যেত আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে গেলে ভরাঢুবি হবে। আওয়ামী লীগ সব আসন ছিনিয়ে নেবে দলীয় ও প্রশাসনে আওয়ামী ক্যাডারদের ব্যবহার করে। এখন তাদের মুখে আবার শোনা যায় উল্টা সূর। তারাই এখন বলছেন, দেশের মানুষ প্রচন্ড আওয়ামী বিরোধী মনোভারে রয়েছে। বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য কাউকে অনুরোধও করতে হবে না। রবং মানুষ নিজে থেকেই এখন বিএনপিকে ভোট দিতে চায়। তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। কোন রকমে একটি ভোট হলেই হবে। মানুষ তখন বিএনপিকে ভোট দিবে। তফসিলের পর মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসবে। সরকার তখন আর সামাল দিতে পারবে না। এই যুক্তি সামনে রেখে শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপিতে।

সবকিছু পরিস্কার হতে আর সপ্তাহ দুয়েক অপেক্ষার পালা। সব ঠিকটাক থাকলে আগামী মাসের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহে নির্বাচনী তফসিল ঘোষনা হতে পারে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি ও নির্বাচনী তৎপরতা দেখলেই সব খোলাসা হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here