বাঘের গলায় হাঁড়

0
75

ফরহাদ মজহার
… … … … … …

গত ১৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়। তাদের ৭ দফা দাবি এবং ১১টি লক্ষ্যের তাৎপর্য বাংলাদেশের জনগণকে সবার আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বোঝাবার তাগিদ বোধ করে নি, বরং ১৭ অক্টোবর লেইক শোর হোটেলে তাদেরকে আগে বোঝাতে হয়েছে বাংলাদেশের পরাশক্তির প্রতিনিধিদের। ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠকে’ কূটনৈতিক মহলকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ডাঃ কামাল হোসেন কী রাজনীতি করতে চান বুঝিয়েছেন। সেখানে কূটনীতিবিদরা কি ধরনের প্রশ্ন করেছেন এবং ঐক্যফ্রন্ট নেতারা কী উত্তর দিয়েছেন তা পুরাপুরি গণমাধ্যমে আসে নি।

কূটনৈতিক মহল ‘ব্যাটলিং বেগমস’দের মাইনাস করতে চায়, এটা এক এগারোর সময় থেকেই আমরা জানি। এক এগারো ব্যর্থ হবার পর গত এক দশক ধরে একজনকে দিয়ে আরেকজনকে মাইনাস করার প্রক্রিয়া জনগণ দেখেছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতি এই ক্ষেত্রে কে আগে মাইনাস হবেন সেটা আগাম নির্ণয় করে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সম্পর্কে জনগণের মধ্যে যে প্রবল বিক্ষোভ বিরাজ করছে তার বিপদ সম্পর্কে কূটনৈতিক মহল খুবই অবগত। কোন অনিশ্চিত বা অনাকাংখিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তারা চান না। কিন্তু পরিস্থিতি এরকম বহাল থাকলে গণরাজনীতি কী রূপ পরিগ্রহণ করবে সেই অনিশ্চয়তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অতএব এটা আন্দাজ করা খুবই সহজ যে কূটনৈতিক মহল বাংলাদেশের শোষক শ্রেণির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটা মীমাংসা চায়।

এই পরিস্থিতিতে সংলাপ নিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে ‘কৌতুহল’ আছে। বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার পর হতাশ হয়ে বসে পড়ার চেয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দিয়ে কূটনৈতিক মহল বাংলাদেশের শাসক ও শোষক শ্রেণির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মীমাংসা কিভাবে ঘটায় সেটা দেখতে জনগণ আগ্রহী। কিন্তু এই কোতুহলকে বুঝতে হলে ইংরেজিতে ‘ডাবল বাইন্ড’ (Double Bind) নামক একটা কথার চল আছে, সেই কথাটা বোঝা দরকার। ‘ডাবল বাইন্ড’ কথাটা আজকাল দার্শনিকেরাও ব্যবহার করেন। ‘ডবল বাইন্ড’ কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনতিক্রম্য জটিলতা বা মুশকিল বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।

নির্বাচনসর্বস্ব শোষক শ্রেণির রাজনীতি নির্বাচনের মূলা দেখিয়ে জনগণকে সব সময়ই সব দেশেই ধূলা দিয়ে থাকে, এটা নতুন কিছু না। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে শ্রমিক, কৃষক বা মেহনতি শ্রেণির পক্ষে শক্তিশালী রাজনীতির অনুপস্থিতি। এই অনুপস্থিতির কারনে বাংলাদেশে নির্বাচন সর্বস্ব রাজনীতি মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও ইসলাম নির্মূলের রাজনীতি জনগণ মোকাবিলা করেছে, কোটা সংস্কার আন্দোলন কিম্বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন গড়ে উঠেছে, ন্যায্য মজুরির জন্য শ্রমিক আন্দোলন দানা বাঁধছে, বীজ ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়ার বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াই চলছে। হতাশ হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের নিষ্ঠুর ও নির্দয় দমন পীড়ন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে ওপর তলায় একটা বদল ঘটুক এটা সাধারণ মানুষ চায়।

কিন্তু এইক্ষেত্রে ‘ডবল বাইন্ড’ হচ্ছে বিদ্যমান রাজনৈতিক দুর্দশার বিকল্প জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়। বিকল্প ফ্যসিস্ট ব্যবস্থা উৎখাতের জন্য জনগণের ঐক্য নির্বাচনী ঐক্য হতে পারে না। অতএব জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ফাঁপা প্রতিশ্রুতির অধিক কিছু হবে না। তাদের সাত দফা এবং এগারো প্রকার লক্ষ্যের উদ্দেশ্য তথাকথিত একটা ‘সুষ্ঠ নির্বাচন’, অর্থাৎ তারা শোষক শ্রেণির জন্যএকটি সমঝোতার নির্বাচন চায়। তাদের আবদার শেখ হাসিনা সংলাপের মধ্য দিয়ে আপোষে তার নিজের বিদায়ের পথ নিজেই তৈরি করুক। যেন ব্যাটলিং বেগমসদের দুই জনকেই বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিদায় করার কাজটা সম্পন্ন করা যায়। সেটা কি সম্ভব? কিন্তু অপরদিকে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থাকুক এটাও জনগণ চাইতে পারে না। ‘ডাবল বাইন্ড’ হচ্ছে এই উভয় সংকটের অনিশ্চয়তা। সংলাপের প্রতি কৌতুহলও এ কারনেই। এতোটুকুই।

সাধারন মানুষের চোখে বর্তমান সরকার ‘অবৈধ’। প্রথমত এই সরকার এক এগারোর ঘটনা এবং সেনা সমর্থিত অসাংবিধানিক সরকারের পরিণতি মাত্র। দ্বিতীয়ত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নামে কোন নির্বাচন ছাড়া সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংসদ গঠনের সাংবিধানিক বৈধতা আছে কিনা সেটা গুরুতর প্রশ্ন হয়ে এখনও জারি রয়েছে। তাহলে গণরাজনীতির প্রথম দাবি হওয়া উচিত বিদ্যমান ক্ষমতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা, বিদ্যমান ক্ষমতাকে সংলাপের নামে বৈধতা দেওয়া নয়।

কিন্তু জাতীয় ঐকফ্রন্ট সংলাপের নামে ঠিক সেই কাজটিই করেছে। এখন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এবং সতেরো বছর কারাদণ্ড দিয়ে বিএনপির নেতারা ডাঃ কামালের নেতৃত্বে প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে ‘সংলাপ’ করবেন।

রাজনৈতিক সভায় আন্দোলনের দাবি হিশাবে সংলাপের প্রস্তাব করা এবং তা আদায় করা এক জিনিস কিন্তু প্রধান মন্ত্রীকে সংলাপের জন্য চিঠি লেখা ভিন্ন বিষয়। কামাল হোসেন লিখিত চিঠি দিয়ে প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ চেয়েছেন। শেখ হাসিনা কামাল হোসেনের সংলাপের চিঠি পেয়েই সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়েছেন। তাঁর দিক থেকে এই চিঠির বিশেষ অর্থ রয়েছে। সংলাপের জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা হিশাবে ডাঃ কামালের চিঠি শেখ হাসিনার ক্ষমতাকে নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা দান করল। বিরোধী দলের কাছ থেকে এই বৈধতা প্রাপ্তি ক্ষমতাসীনদের জন্য জরুরি ছিল। আনন্দেরও বটে। কারন আগামি নির্বাচনে, যদি সেটা আদৌ অনুষ্ঠিত হয়, ক্ষমতাসীনদের প্রধান এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের ক্ষমতার বৈধতা নিশ্চিত করা। সেই দিক থেকে বিচার করলে সংলাপের ফায়দা শেখ হাসিনা কামাল হোসেনের চিঠি পেয়ে সংলাপের আগেই হাসিল করে নিয়েছেন।

গ্রামে যখন ডাকাত পড়ে তখন চিঠি দিয়ে ডাকাত কখন গ্রাম ছেড়ে যাবে সেটা গ্রামবাসী আলোচনা করেছে ইতিহাসে এমন কোন নজির নাই। কাজ হচ্ছে গ্রামবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে ডাকাত তাড়ানো।

তৃতীয়ত গুমখুন, আইনবহির্ভূত হত্যা, ব্যাংক লুট ও দুর্নীতি, কাউকে কথা বলতে না দেওয়া, গণসমাবেশ করতে না দেওয়া, তদুপরি প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো ভয়ংকর আইন পাশ করা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনরা তাদের যে রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে চলেছে তার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়ে রয়েছে। চতুর্থত বিরোধী দলকে ক্রমাগত দমন পীড়ন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং শেষাবধি বিচার বিভাগের রায়ে তাঁর সাজা বাড়ানোকে স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহংসার অধিক সাধারন মানুষ গণ্য করে না।

বলা বাহুল্য, বিরোধী দল হিশাবে বিএনপির কাছ থেকে যে ‘রাজনীতি’ আশা করেছিলো সেই ক্ষেত্রে হতাশা আছে। যে কারনে বর্তমান সরকারের প্রতি বিরূপ হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির পেছনে মানুষ দাঁড়ায় নি। না দাঁড়ানোর আরেকটি কারন হচ্ছে সাধারন মানুষ মনে করে বিএনপিও জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ধারন করার চেয়েও বিদেশীদের তুষ্ট করেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়। তার ফল বিএনপি এখন ভোগ করছে। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কোন নীতি, আদর্শ বা কর্মসূচিগত লড়াই সংগঠিত করতে বিএনপি অক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু এখন তারা জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে গিয়ে কামাল হোসেনের নেতৃত্বে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে সাত দফা কর্মসূচি ও ১১টি লক্ষ্য প্রস্তাব করছে! কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের আগে স্বাধীন ভাবে বিএনপি তাদের দাবি ও লক্ষ্য ঘোষনা করতে ব্যর্থ হোল কেন? এটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এরপরও বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচন সাধারন মানুষ কিভাবে গ্রহণ করে সেটা বাঘের গলায় হাঁড়ের মতো বিঁধে আছে। এবং থাকবে। বাঘের গলা থেকে এই হাঁড় বের করা জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের পক্ষে সম্ভব না। ক্ষমতাসীনদের বৈধতা দেওয়া ছাড়া আজকের সংলাপে খালেদা জিয়ার সুবিচার মুখ্য বিষয় করা না গেলে সংলাপ মূলত খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে কামাল হোসেনকে বিএনপির নেতা হিশাবে অভিষিক্ত করার অধিক কিছু হবে না।

তো ডাঃ কামাল হোসেনকে আগাম অভিনন্দন । খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখার বিষয়টি নিছকই আইনী ব্যাপার, রাজনৈতিক নয়, সেটা বিএনপির নেতারা আমাদের যতোই বোঝাক বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাঘের গলায় হাঁড়ের মতো এটা বিঁধে থাকবে।

দেখা যাক। ইতিহাসের আরেক নাম ভানুমতি। তিনি তার খেল দেখান সময় বুঝে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here