পেরেছে বাংলাদেশ, পারবে কি?

0
63

 

শিবলী সোহায়েল

 

দু’দিন পরেই নির্বাচন। সবাই উৎকণ্ঠিত। চারিদিক থেকে পরিচিতজনদের একটাই জিজ্ঞাসা, কি হতে যাচ্ছে ত্রিশ তারিখে? মাসকাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক অধ্যাপক বন্ধুও জানতে চাইল, কি হবে? কি হতে পারে? এবার পারবে কি বাংলাদেশ? আমার উত্তর পরিস্কার। বললাম, এতদিন তো পেরেছে, সুতরাং পারবে নিশ্চয়। তবে তা নির্ভর করছে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর। তার আগে একটু দেখে নেই কি কি পেরেছে বাংলাদেশ।

 

১। বাংলাদেশ এক হতে পেরেছে:

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে। দেশে এখন সমগ্র বাংলাদেশ বনাম আওয়ামী লীগের লড়াই চলছে। গত ত্রিশে জুলাই দি ইকোনোমিস্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে, অ্যামেরিকার প্রাক্তন সেক্রেটারি অব স্টেট এবং “Fascism: A Warning” বইয়ের লেখিকা মেডলিন অলব্রাইট বলেন, The right response to thuggish politics is not more thuggery; it is a coming together across the ideological spectrum of people who want to make democracies more effective”. বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, সহিংস রাজনীতির জবাব আরও সহিংসতা নয় বরং বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ যারা গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে চায় তাদের সবার একসাথে হওয়া। বাংলাদেশে ঠিক এই কাজটিই করতে পেরেছে, গণতন্ত্রকামী মানুষেরা এখন ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে একসাথে হয়েছে।

আমি গত কয়েকমাস ধরে বলে আসছিলাম যে বিএনপিকে গোটা বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলতে হবে। দেশের সকল নির্যাতিত মানুষের হয়ে কথা বলতে হবে। সমগ্র দেশটাকে একসাথে নিয়ে আসতে হবে, একমাত্র তাহলেই আওয়ামী ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে সুফল পাওয়া যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতে এটা স্পষ্ট যে বিএনপি সেটা পেরেছে। ত্রিশ তারিখের ফলাফল যাই হোক না কেন এটা একটা বিশাল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কারণ একটি বা দুটি দলকে দমন করা যতটা সহজ বা যতদিন দমন করে রাখা যায়, একটা দেশকে বা সমগ্র জাতিকে দমন করা ততটা সহজ নয় বা বেশীদিন দমন করে রাখা যায় না।

আওয়ামী লীগ তাদের আক্রমনটা প্রথমে শুরু করেছিল জামায়াতের উপরে। তারপর হেফাজত হয়ে ধীরে ধীরে ওরা এগোতে থাকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দিকে। এরপর একে একে চড়াও হয় সাধারন মানুষের উপর।ওদের হিংস্রতা থেকে বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্র এমনকি কোমলমতি স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরাও রেহাই পায় না । ফ্যাসিস্ট হিটলারের টেমপ্লেট অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ এই আক্রমণে উগ্র চেতনা, ঘৃণা ও বিদ্বেষকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করে।

হিটলারও এই উগ্র চেতনা, ঘৃণা ও বিদ্বেষকে পুঁজি করেই প্রথমে টার্গেট করেছিল সোস্যালিস্টদের তারপর ট্রেড ইউনিওনিস্টদের এবং শেষে ইহুদীদের গ্রাস করে তার ঘৃনার বিষ ছড়িয়েছিল বিশ্বময় । আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হয়তো বিশ্বময় পৌঁছাবার সক্ষমতা রাখেনা তবে বাংলাদেশকে গ্রাস করবার খায়েস ও প্রচেষ্টা তাদের পুরোপুরিই আছে।

দেশের সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসাটা বিএনপি, ব্যারিস্টার মইনুল এবং অন্যান্য উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব কঠিন একটা কাজ ছিল। এই ঐক্যকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য দলদাস মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর এনেইবলার হিসেবে সবসময় তৎপর ছিল। সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তারেক জিয়ার ইমেজ এবং জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা। এখানে মনে রাখতে হবে যে আওয়ামী ফ্যাসিস্টবাহিনীই অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে তারেক জিয়াকে দুর্নীতিবাজ এবং জামায়াতকে যুদ্ধপরাধী ট্যাগ লাগিয়ে দেশময় ঘৃণার চাষ করেছে বহুবছর ধরে।

তারেক জিয়াকে ছাড়া বিএনপিকে কল্পনায় করা যায় না আবার তার এই ইমেজের কারণে তাকে সাথে নিয়ে ড. কামালদের সাথে ঐক্যও ছিল কঠিন। ঐক্যের জন্য ড. কামালদের ফেস ভ্যাল্যুর প্রয়োজন অস্বীকার করা উপায় নেই। তবে তাদের সাথে তেমন কোন ভোটার নেই। এদিকে জামায়াতের ফেস ভ্যাল্যু নিয়ে চরম সঙ্কট থাকলেও তাদের আছে বেশ বড় এবং সুনির্দিষ্ট একটি ভোট ব্যাঙ্ক। তাছাড়া গত আঠারো বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটা বড় লক্ষ্য ছিল বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি। এই কাজে তারা ব্যবহার করে আসছিল তাদের দলদাস সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের। এদের কাজই ছিল জামায়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে বিএনপি এবং অন্যান্য নেতাদেরকে বিব্রত করার মাধ্যমে এমন কোন কথা বের করে আনা যাতে করে এই জোটে ফাটল ধরানো যায়। এই এনেইবলারদের প্রশ্ন শুনলে যে কারও মনে হতে পারে দেশে গুম খুন, ব্যাঙ্ক লুট, ভোট লুটের চাইতেও জামায়াতের সাথে বিএনপির জোটই বোধহয় সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাদের এই প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে দেখা যায় ব্যারিস্টার মইনুল, ড. কামাল সহ সমস্ত নেতাদেরকেই। এটা তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবেই করে আসছে এবং এখনও করছে। ত্রিশ তারিখে কোন আমূল পরিবর্তন না আসলে সামনেও তাদের এই একই অস্ত্র ব্যবহার করার সম্ভাবনা আছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিএনপি কেন তাহলে জামায়াতকে বাদ দিচ্ছে না। শুধুই কি ভোট ব্যাঙ্ক? না শুধু তা না, এখানে আরও একটি মজার ব্যাপার হল, বিএনপি জামায়াতকে বাদ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ৯৪ /৯৫ সালের মত আওয়ামী লীগ আবার জামায়াতকে কোলে তুলে নিতে পারে। এই সম্ভাবনাকে এ মুহুর্তে অবিশ্বাস্য মনে হলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যারা হেফাজতকে মেরে কেটে, তেতুল হুজুর আখ্যা দিয়ে আবার শফি হুজুরের পায়ে পড়ে যায় তাদের পক্ষে এটা একেবারেই অসম্ভব কিছু না।

অবশ্য জামায়াত যাদেরকে জুডিশিয়াল কিলার বলে মনে করে সেই আওয়ামী লীগের সাথে তারা আর ঘেষবে কিনা সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু বিএনপির দিকে থেকে চিন্তা করলে, হেফাজতের উদাহারন যেখানে জ্বলজ্বল করছে, সেখানে তারা এই আশংকা করতেই পারে। তাছাড়া বিএনপি-জামায়াতের জোট যেহেতু বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে একটি বিশেষ নিয়ামক, এর বিভক্তি হবে আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সুকৌশলে তাদের বিশ দলীয় জোট অটুট রেখেই জাতীয় ঐক্য করতে পেরেছে। তারা তারেক জিয়াকে সসম্মানে তার অবস্থানে রাখতে পেরেছে আবার ড.কামালকেও প্রাপ্য সম্মান দিয়ে তাকে সাথে নিয়ে আসতে পেরেছে।

বিশেষ কোন দল বা আদর্শ নয় বরং এই ঐক্যফ্রন্টকে প্রকৃত অর্থেই একটি জাতীয় ঐক্যের রুপ দিতে পারায় ধীরে ধীরে এই ঐক্য কোটা আন্দোলনের তরুনদের সহ সমস্ত জনসাধারণের সমর্থন পেতে সমর্থ হয়েছে। এমনকি একসময়ের ডাকসাইটে আওয়ামী নেতা যারা আওয়ামী লীগের এই ফ্যাসিস্ট চরিত্রের সাথে একমত হতে পারেননি তারাও যোগ দিয়েছেন এই ঐক্যে।

তাই আমি মনে করি ত্রিশ তারিখের ফলাফল যাই হোক বাংলাদেশের জন্য এই ঐক্য একটি বিশাল অর্জন।

 

২। আওয়ামি লীগকে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত করতে পেরেছে:

উন্নয়নের বুলি দিয়ে আইয়ুব – ইয়াহিয়ারাও বাংলাদেশকে পদানত করতে চেয়েছিল, শোষণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তাদেরকে সফলভাবে পরাস্ত করেতে পেরেছিল। আজও দেখা যাচ্ছে সেই আইয়ুব-ইয়াহিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শেখ হাসিনাও চাইছে তার লুট-পাট আর গুম খুনকে বৈধ করে নিতে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। শুধুমাত্র দলদাস মিডিয়া আর দলান্ধ বুদ্ধিজীবীরা গোয়েবলসের কি-বোর্ডের মত একই সুরে উন্নয়নের গান গেয়ে চলেছে, সাথে যোগ দিয়েছেন কিছু সেলিব্রিটি। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তা গ্রহন করছে বলে মনে হচ্ছে না।

এখানে একটি জিনিস স্মরন করা যেতে পারে, আর তা হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীরা রাজনৈতিক ভাবে পরাজিত হয়ে তাদের অপকর্মের বৈধ্তা দিতে বাংলাদেশের ৫৫ জন সেলিব্রিটিকে ব্যাবহার করেছিল। এই সেলিব্রিটিদের মধ্যে গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন, ফেরদৌসি রহমান, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, লাইলা আর্জুমান্দ বানু, নিনা হামিদ, গায়ক আব্দুল আলিম, এম এ হাদী, অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক খান আতা, ফতেহ লোহানি, কবি আহসান হাবিব, তালিম হোসেন, নাট্যকার মুনির চৌধুরীদের মত বড় বড় সেলিব্রিটিরা ছিলেন (তথ্য সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান, ১৭ই মে, ১৯৭১)। কিন্তু জনগণ সেসময় তাদের কথা গ্রহন করেনি।

উপরের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা যখন শোষণ নিপীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েন তখন তারা সেলিব্রিটিদের আশ্রয় নেন। এবারেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি, আওয়ামী লীগ মাঠে নামিয়েছে অনেক সেলিব্রিটি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, খেলোয়ার মাশরাফি ও সাকিব, গায়ক তাহসান এবং অভিনেতা ফেরদাউস। এটা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ত এবং পরাজয়েরই একটি প্রমান। ১৯৭১ সালের মতই এবারেও কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের কথা শুনছেনা। তাদের ফেসবুক পোষ্টে সাধারণ লোকজনদের কমেন্ট পড়লেই ব্যাপারটা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

আরেকটি বিষয় হল, আওয়ামী লীগ ভাবতেও পারেনি এত বৈষম্য মেনে নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসবে। গত দশ বছরের রাজনীতিতে এটা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য বিরাট একটা ধাক্কা। আওয়ামী লীগ খুব ভাল করেই জানে তাদের জনপ্রিয়তা এখন তলানিরও নিচে। আর তাই ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণ তাদেরকে পুরোপুরি বেসামাল করে তুলেছে। আর কোন রাজনৈতিক পন্থা খুঁজে না পেয়ে তারা এখন মরিয়া হয়ে সহিংসতা ও ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখবার চেষ্টা করছে।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে সম্পুর্ন পরাস্ত হয়েই এমন পথ বেছে নিয়েছে। তারা এখন তাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করছে ঐক্যফ্রন্টের কর্মী, সমর্থক এমনকি প্রার্থীদেরকেও গ্রেফতার, গুম, আহত এবং হত্যা করতে। ঐক্যফ্রন্টের প্রচারনায় তারা তাদের গুন্ডা বাহিনী এবং পুলিশকে লেলিয়ে দিচ্ছে এবং তা ফলাও করে তাদের মিডিয়াতে প্রচার করছে। তাদের মূল চেষ্টাই হচ্ছে মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোট কেন্দ্র থেকে দুরে রাখা। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এতটা নৃশংসতা ও নির্মমতা কখনো চোখে পড়েনি। অনেকে বলেন পাকিস্তান আমলেও না বরং ৭৩ সালের নির্বাচনে এর কিছুটা হয়ত দেখা গিয়েছিল। এই সহিংসতা আসলে আওয়ামী লীগের জন্য বিশাল এক রাজনৈতিক পরাজয় এবং বাংলাদেশের মানুষের বিজয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।

আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে আওয়ামী লীগের প্রোপ্যাগান্ডা মেকানিজম সবসময়ই খুব শক্তিশালী। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটাও খুব একটা কাজ করছে না। অতি সম্প্রতি, তাদের বানানো আটশ কোটি টাকা উদ্ধারের নাটক এবং ড. কামাল হোসেনকে হত্যার নাটক জনমনে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। উভয় নাটকেই তারা ভিলেন হিসবে তারেক জিয়াকে নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু সাধারণ মানুষ বিষয়টা খুব একটা গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না।

ত্রিশ তারিখে যদি আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের মত ভোট জালিয়াতি করে ক্ষমতা দখল করেও রাখে, তাহলেও এবারের এই চরম পরাজয়গুলোকে নিয়ে স্বাধীনতাকামী এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে খুব বেশী দিন শোষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি খুব স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে আওয়ামী লীগের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।

 

ভারতিয় বিনিয়োগে উগ্র চেতনা ও ঘৃণার চাষ বাংলাদেশ বন্ধ করতে পেরেছে:

দয়া করে কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে আওয়ামী লীগের এই উগ্র চেতনাকে মেশাবেননা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হল, সাম্য, সুবিচার, মানবিক মর্যাদা ও গণতন্ত্র। কিন্তু দুই হাজার নয় সালে ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ মূলত: মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে এক চরমপন্থি ও ফ্যাসিবাদী উগ্র চেতনার চাষ শুরু করে যার সাথে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার কোন মিলই নেই।

আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন বিখ্যাত দি ইকোনমিস্ট পত্রিকা লিখেছিল, ভারত থেকে বস্তা ভর্তি টাকা এনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে জেতার পর থেকেই আওয়ামী লীগ ভারতীয় বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে উঠে পড়ে লাগে উগ্র চেতনা ও ঘৃণার চাষ করতে। শুরু হয় বিদ্বেষ ও বিভক্তির রাজনীতি। তর্ক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। বাংলাদেশের মানুষকে বিভক্ত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে। এধরণের বিভক্তি স্বাধীনতার পরপরই হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিলোনা। কিন্তু আমরা ১৯৭২ -৭৫ এর রাজনীতিতে এমনকি তারপরবর্তি কোন রাজনীতিতেও এধরণের স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বিভক্তি দেখিনি। এছাড়াও নাস্তিক-আস্তিক বিতর্ক, বিডিআর বিদ্রোহ, বৌদ্ধ মন্দিরে আক্রমণ, ব্লগার খুন, বিদেশী ডিপ্লম্যাট খুন ইত্যাদি ইস্যুর পর ইস্যু তৈরি করে জনসাধারণকে টেনে নামানো হয় বিভক্তি, বিদ্বেষ আর ঘৃণার অতলে।

কিন্তু আজ বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের মানুষ এই সমস্ত বিভক্তিকে একপাশে সরিয়ে রেখে ফ্যাসিস্ট শোষকের বিরুদ্ধে এক হতে পেরেছে। অবাক হয়ে দেখছি, ভারতও আওয়ামী লীগের উপর খুব একটা খুশি নয়। ভারতের জাতীয় পত্র-পত্রিকা, যেমন, দি হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দি পাইওনিয়ার, ইন্ডিয়া টুডে এমনকি প্রাদেশিক পত্রিকা আনন্দ বাজারের সমসাময়িক লিখা গুলি দেখলে খুব ভালভাবেই বোঝা যায় যে তাদের ইনভেস্টমেন্ট জলে যাওয়া নিয়ে তারা শেখ হাসিনার উপর যথেষ্ট বিরক্ত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য কারও উপর তারা আস্থাও রাখতে পারছেনা। আওয়ামী লীগ জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে তাদেরকে যতটা দিয়েছে আর কে তাদেরকে এতটা দেবে?

খুব বেশী ব্যখ্যায় না গিয়ে আজ শুধু এতটুকুই বলব, বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদ্বেষের যে বিষ তারা ছড়িয়েছে তা হয়তো এত দ্রুত উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অন্তত আজ এই বিদ্বেষ -বিভক্তিকে পরাভূত করে একসাথে সামনের দিকে এগুনোর চেষ্টা করছে। যদিও আওয়ামী এনেইবলাররা সেই উগ্র চেতনার সুর বাজিয়েই চলেছে।

 

আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ তার ইমেজ ফেরাতে পেরেছে:

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর, পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে বই ছাপিয়ে বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছিল। তারা সবসময় বিদেশিদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে বাংলাদেশে জঙ্গি সমস্যা নিরসনে তাদের ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে এমন আত্নঘাতি প্রচারনা ছিল বিস্ময়কর।

সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ, ইউরিপিয়ান পার্লামেন্ট, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং অন্যান্য দেশগুলো তাদের বিবৃতিতে অবাধ ও নিরেপেক্ষ নির্বাচনের দিকেই জোর দিয়েছে। গেল বেশ কয়েকবছর ধরে তাদের কোন কথা অথবা তাদের মিডিয়া রিপোর্ট পর্যবেক্ষন করে মনে হয়নি যে তারা আওয়ামী লীগের জঙ্গিবাদের প্রচারনায় খুব একটা প্রভাবিত হয়েছে। এটাও বাংলাদেশের জন্য বড় একটা বিজয়।

 

৫। আওয়ামী লীগ হেরেছে:

আওয়ামী লীগের হারার ক্ষতিয়ান দিয়ে এই লিখাটাকে আর দীর্ঘ করতে চাচ্ছিনা। তবে তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার কথা বোধহয় একটু উল্লেখ না করলেই নয়। সেটা হল বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করার প্রচেষ্টায় তারা সম্পুর্ন ব্যার্থ হয়েছে। ১৯৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত তারা জাসদ সহ প্রায় সবকটি বিরোধীদলকে নির্মূল করে দিয়েছিল। সেই তুলনায় আওয়ামী লীগের গত দশ বছরের প্রচেষ্টার পরও আমরা দেখছি বিরোধীদলগুলো এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী ও জনপ্রিয়। আর ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের ভয় এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

 

ভারতীয় সমর্থন, দলীয় প্রশাসন, বিচার ব্যাবস্থা, দলদাস মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী এবং রক্ষীবাহিনীর আদলে পরিচালিত র‍্যাব ও পুলিশ নিয়ে ফ্যসিস্ট আওয়ামী লীগের যে মহা পরাক্রমশালী বাহিনী, তার বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অর্জিত এই অর্জনগলো অভূতপূর্ব । এখন প্রশ্ন হচ্ছে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ পারবে তো?

 

বাংলাদেশ পারবে কি?:

ফ্যাসিবাদকে বাইরে থেকে দেখতে খুব শক্তিশালী মনে হলেও এদের ভিত্তি থাকে খুব দুর্বল। এরা মানুষকে ভয় দেখিয়ে বসে রাখতে চায়। কিন্তু একবার যদি মানুষ ভয়কে জয় করতে পারে তাহলে ফ্যাসিস্ট কাঠামো খুব দ্রুতই ভেঙ্গে পড়ে। কারণ এরা জানে এদের অপরাধের মাত্রা কতটা গভীর। বাংলাদেশ এই ত্রিশ তারিখেই সফল হবে কিনা তা নির্ভর করছে একটি গণজাগরণের উপর। যদি সেদিন একটি গণজোয়ার ওঠে তাহলে তা ঠেকানোর সাধ্য আওয়ামী লীগের নেই।

আওয়ামী লীগ এমুহুর্তে একটা পয়েন্ট অব নো রিটার্ন অবস্থায় চলে গেছে। তাই তারা মরিয়া হয়ে টিকে থাকবার শেষ চেষ্টা করছে। তারা ভাবছে টিকতে না পারলে বাংলাদেশ তাদেরকে শেষ করে ফেলবে। তাই প্রয়োজন তাদেরকে আশ্বাস দেবার, একটি সুযোগ দেবার। তাদেরকে শক্তভাবে বলা প্রয়োজন, আর এক ফোটা রক্ত যদি ঝরে, একটা ভোট যদি লুট হয় তাহলে ওদেরকে ক্ষমা করবেনা বাংলাদেশ। কিন্তু ওরা যদি এখন পিছিয়ে যায়, ওরা যদি এখন মানুষকে নিরাপদে ভোট দিতে দেয় তাহলে ওদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

গনজোয়ার সৃষ্টি এবং আওয়ামী লীগ ও তার হানাদার বাহিনীকে পিছু হটানোর জন্য এখন প্রয়োজন একটি আগুন ঝরানো বক্তৃতার। যেই বক্তৃতা পৌঁছে যাবে মানুষের ঘরে ঘরে। জাগিয়ে তুলবে ভয়ার্ত মানুষকে আর কাঁপুনি ধরিয়ে দেবে হানাদারদের বুকে। জানিনা, মির্জা ফখরুল অথবা ড. কামালের কাছ থেকে এধরণের আগুন ঝরানো, শক্তিশালী একটা দিকনির্দেশনা নির্বাচনের আগে  জাতি পাবে কিনা।

মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগ যদি এবার টিকে যায় তাহলে তারা ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করতে পারে। তবে প্রত্যাশার কথা হচ্ছে, প্রচন্ড বৈরি অবস্থার মধ্যে দিয়েও যে অর্জনগুলো বাংলাদেশকে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে তা স্পস্টভাবেই ইঙ্গিত করছে যে বাংলাদেশ পারবে। এমনকি ত্রিশ তারিখের ফলাফল যদি আপাত:দৃষ্টিতে  ইতিবাচক নাও হয় তবুও বাংলাদেশ পারবে, তা এখন নিশ্চিত করেই বলা যায়। একটি গণজোয়ার বাংলাদেশকে আবারও মুক্তির আস্বাদ দেবে। হয়তো তা এ ত্রিশ তারিখেই, অথবা শীঘ্রই।

 

(লেখক: লেকচারার, চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়া।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here