আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতির পরিকল্পনা ও নীলনকশা কেমন ছিল!!!

0
227

 

বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচনের ঠিক আগের দিন,২৯শে ডিসেম্বর রাতে পুলিশের হেডকোয়ার্টার থেকে ৩৪ পৃষ্ঠার এক ভোট ডাকাতির গোপন নীলনকশা ফাঁস হয়ে যায়। এই নীলনকশার দলিলটি  মূলত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের জন্যেই তৈরি করা হয়েছে বলে মনে হয়। সম্ভবত এটি বিভিন্ন পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সামনে প্রেজেন্ট করে তারপর সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।  চৌত্রিশ পৃষ্ঠার এই গোপন নথিতে বেরিয়ে আসে ত্রিশে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতির ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের গোপন তথ্য ।  নথিটি পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যায় এই চক্রান্তে অত্যন্ত সুদক্ষ একদল গবেষককে কাজে লাগানো হয়েছিল।  এই গোপন নথিতে ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দলের ভোটার সংখ্যার বিস্তারিত পর্যালোচনা করে সারা দেশের সকল কেন্দ্রকে ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে হয়।  তারপর বিশেষ বিশেষ কেন্দ্রগুলোকে টারগেট করে চক্রান্তের গভীর জাল বোনা হয়। এই নথীতে বেশ স্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে কোন ক্যাটাগরির  কেন্দ্রগুলোতে  কট্টর আওয়ামী পন্থী প্রিজাইডিং অফিসারকে দায়িত্ব দিতে হবে,কিধরণের পুলিশ সেখানে নিয়োগ করতে হবে, পুলিশের আচরণ কেমন হবে  এবং ভোট ডাকাতির সুবিধার্থে ভোট গ্রহণের গতি,প্রকৃতি ও কৌশল কেমন হবে।

 

এই নীলনকশার শিরনাম,

How to win 11th Bangladesh General Election 2018

“Strictly for Bangladesh Awami League”

অর্থাৎ, “কিভাবে একাদশ বাংলাদেশ সাধারণ নির্বাচন ২০১৮ তে জয়ী হওয়া যায়”। এবং এর দ্বিতীয় লাইনে স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে, “শুধু মাত্র আওয়ামী লীগের জন্য”। বোঝা যাচ্ছে যে দ্বিতীয় লাইনটি যুক্ত করা হয়েছে এই নথির সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য যাতে করে এটি আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারও হাতে না পড়ে। তবে এই গোপন চক্রান্ত নথিটি পুলিশের হেড কোয়ার্টার থেকে ফাঁস হওয়ায় বোঝা যায় যে এই চক্রান্তে বাংলাদেশ পুলিশের অত্যন্ত উঁচু মহলের গভীর যোগ-সাজিস রয়েছে।

 

ভোট ডাকাতির নীলনকশার প্রথম পাতা 

 

এই নথিটি পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের হাতে পৌঁছে। তিনি সাথে সাথেই তা বাংলাদেশ পলিটিকো নামে তার ওয়েব ব্লগে প্রকাশ করেন।  ডেভিড বার্গম্যানের  https://bangladeshpolitico.blogspot.com, ওয়েব ব্লগটির প্রচার বাংলাদেশে বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের অনেক মানুষই এখন পর্যন্ত এবিষয়ে জানতে পারেনি। যদিও বার্গম্যান তার ফেসবুকে এবিষয়ে একটি পোস্ট দিয়ে সেখানে উল্লেখ করেন, “Documents suggest Bangladesh Awami League rigging election by ensuring “Core AL Presiding Officer”, “Strict policing” and “Slow Casting” at polling centres in areas were opposition could win” – অর্থাৎ, দলিলপত্রে দেখা যাচ্ছে যে “কট্টর পন্থী  আওয়ামী প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ”,”কঠোর পুলিশিং” এবং “ধীর ভোট গ্রহণ ” ইত্যাদি কৌশলের মাধ্যমে  আওয়ামী লীগ  ভোট ডাকাতি করে বিজয় নিশ্চিত করতে যাচ্ছে।

 

ডেভিড বার্গম্যানের ফেসবুক পোস্ট

 

বার্গম্যানের ফেসবুক পোস্টের সাথে তিনি বাংলাদেশী পাঠকদের জন্য একটি নোট লিখে জানিয়েছেন, পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে পাওয়া গোপন নথিটি ফেসবুকে আপলোড করা সম্ভব হচ্ছেনা এবং  বিডি পলিটিকো ওয়েব ব্লগটি বাংলাদেশে বন্ধ থাকায় পাঠকরা  হয়তো সেখান থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন না।

 

ডেভিড বার্গম্যানের ব্লগ

 

তবে বাংলাদেশের বাইরের পাঠকরা এই গোপন চক্রান্ত  নথিটি বিডি পলিটিকো থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন। পাঠকদের সুবিধার্থে সম্পুর্ন নীলনকশাটি পিডিএফ আকারে আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করে দিচ্ছি। এই চক্রান্ত নথির দ্বিতীয় পাতা থেকে একত্রিশ পাতা পর্যন্ত  আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত এবং জাতীয় পার্টির ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভোট প্রাপ্তির উপর ভিত্তি করে এবং ১৭২ টি নির্বাচনী এলাকার পর্যালোচনা করে, নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোকে ছয়টি ক্যাটাগরিতে  ভাগ করা হয়। ক্যাটাগরিগুলোর নাম দেওয়া হয় – AL Win Centres, BNP Win Centres, JP Win Centres, JI Win Centres, Other Win Centres এবং Marginal Win Centres।   কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ভোট ডাকাতির টার্গেট এবং কৌশল ঠিক করা হয়।

 

এই নথির বত্রিশ এবং তেত্রিশ নম্বর পাতার প্রথমেই উল্লেখ আছে “MUST HAVE A Strong Centre Committee combination of AL+JP”, অর্থাৎ – আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সমন্বয়ে প্রতিটি কেন্দ্রেই একটি করে শক্তিশালী কমিটি অবশ্যই থাকতে হবে। এর পর পরই উল্লেখ করা হয়েছে কোন ক্যাটাগরিতে কি ধরনের প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করতে হবে, এবং পুলিশের আচরণ ও ভোট গ্রহণের কৌশল  কেমন হবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে।

 

বত্রিশ নম্বর পাতায় ভোট ডাকাতির নিম্নলিখিত কৌশলগুলো বেশ স্পষ্টভাবেই উল্লেখিত হয়েছে :

 

১। AL Win Centres – আওয়ামী লীগ বিজয়ের সম্ভাবনার কেন্দ্রগুলোতে বলা হচ্ছে, more casting facilities by AL, অর্থাৎ – আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভোট দেওয়ার আরও সুব্যবস্থা করা।

 

২। BNP Win Centres – বিএনপি বিজয়ের সম্ভাবনা যে কেন্দ্রগুলোতে সেখানে “কট্টর পন্থী আওয়ামী লীগ দলীয় প্রিজাইডিং অফিসার” (Core AL Presiding Officer)  নিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।  এখানে লক্ষণীয় যে,  সাধারণ আওয়ামী লীগ সমর্থক হলে হবে না, একেবারে Core বা কট্টর পন্থী আওয়ামী লীগ হতে হবে । এই কেন্দ্রগুলোতে ভোট ডাকাতি নিশ্চিত করতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, Strict Policing বা শক্ত পুলিশি ব্যবস্থা রাখার কথা যেন বিএনপির ভোটাররা কোন সুযোগই না পায়। একই সাথে এই কেন্দ্রগুলোতে খুব ধীর গতিতে (Slow Casting) ভোট গ্রহণের কৌশল অবলম্বন করার কথা বলা হয়েছে।

 

৩।   JP Win Centres – জাতীয় পার্টি বিজয়ের সম্ভাবনা যেই কেন্দ্রগুলোতে সেখানে কৌশল হিসেবে এই নথিতে দুটি বিষয় বলা হয়েছে, Good team work of AL+JP এবং More Casting facility by AL+JP । এই দুটি পয়েন্ট থেকে যা বোঝা যায় তা হল জাতীয় পার্টির কেন্দ্রগুলোতে উভয় দলের ভাল যোগ-সাজিসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে ও জাতীয় পার্টির ভোটারদেরকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিক সুবিধা নিশ্চিত করা।

 

৪। JI Win Centres – নীলনকশাতে দেখা যাচ্ছে জামাতের বিজয়ের সম্ভাবনা আছে যেই কেন্দ্রগুলিতে সেখানে ভোট ডাকাতির সবচেয়ে কঠোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ক্যাটাগরিতে প্রথম কৌশল হিসেবে VVI Strict Policing অর্থাৎ এ কেন্দ্রগুলোতে অত্যন্ত শক্ত পুলিশি ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হচ্ছে ।  এখানে  Strict Policing  এর আগে VVI যুক্ত করা হয়েছে।  এর পরপরই ভোট ডাকাতি পরোপুরি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এই কেন্দ্রগুলোতে “কট্টর পন্থী আওয়ামী লীগ দলীয় প্রিজাইডিং অফিসার” (Core AL Presiding Officer) নিয়োগ করার কথা এবং খুব ধীর গতিতে (Slow Casting) ভোট গ্রহণের কৌশল অবলম্বন করার কথা বলা হয়েছে।

 

 

ভোট ডাকাতির নীলনকশার ৩২ নং পাতা

 

এছাড়া দেখা যাচ্ছে ৫ ও ৬ নম্বর ক্যাটাগরিতে মূলত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে ভাল যোগ – সাজিসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে ও জাতীয় পার্টির ভোটারদেরকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিক সুবিধা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তেত্রিশ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যাচ্ছে ৬ নং ক্যাটাগরিটি আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, Marginal Win Centres by AL / JP এবং  Marginal Win Centres BNP / JI। শেষ ক্যাটাগরিটিতে বিএনপি জামাতের জেতার কিছুটা সম্ভাবনা থাকায়  “কট্টর পন্থী  আওয়ামী প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ”,”কঠোর পুলিশিং” এবং “ধীর ভোট গ্রহণ কৌশল” – এর মাধ্যমে  আওয়ামী লীগ  ভোট ডাকাতি করে বিজয় নিশ্চিত করার কথাই মূলত উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোট ডাকাতির নীলনকশার ৩৩ নং পাতা   

 

যেখানে নির্বাচনের পরিচালনার দায়িত্বে কোন দলীয় ব্যক্তি নয় বরং নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বাছায় করে নিয়োগ দেওয়ারই রিতি সেখানে খুব স্পষ্ট করেই এই নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে  যে বিএনপি ও জামাতের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা যেই কেন্দ্রগুলোতে সেখানে “কট্টর পন্থী  আওয়ামী প্রিজাইডিং অফিসার ”  নিয়োগের কথা। এবং এর পাশা পাশী  উল্লেখ করা হয়েছে “কঠোর পুলিশিং” এবং “ধীর ভোট গ্রহণ ”  কৌশলের কথা। ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে এই নীলনকশার বাস্তবায়ন খুব স্পষ্ট হয়েই ফুটে ওঠে।

 

এই ভোট ডাকাতির সম্ভাবনার কথা বাংলাদেশের মানুষ প্রথম থেকেই আঁচ করতে পারলেও পুলিশ এবং প্রশাসনকে ব্যাবহার করে যে আওয়ামী লিগ এতটা গভীর ও ভয়ঙ্কর চক্রান্তের নীলনকশা সাজাবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তাছাড়া সম্ভবত বিশ্বের ইতিহাসে ভোট ডাকাতির এমন লিখিত নীলনকশা ফাঁস হওয়ার ঘটনা এই প্রথম।

 

এই নীলনকশায় উল্লেখিত কৌশলগুলো দেখে বোঝা যায় এটা তৈরি করা হয়েছিল মূলত নির্বাচনের দিনের জন্য। এই লিখিত নথীতে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধারনা করা হয় যে নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিনের অন্যান্য ঘটনাগুলিও এই বিশাল চক্রান্তেরই অংশ। যেমন, নির্বাচনের আগে ১৮ জন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল, ১১ জন প্রার্থীকে গ্রেফতার, অন্য প্রার্থীদের উপর সহিংস আক্রমণ, ভোটারদের উপর সন্ত্রাসী তাণ্ডব,  আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের ভিসা না দেওয়া ও দেশের পর্যবেক্ষকদের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা  আরোপ,ব্যাক্তিগত পর্যায়ে কিছু ভাড়া করা বিদেশী পর্যবেক্ষক নিয়োগ, ইলেকশন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া লিস্ট ধরে ধানের শিষের পোলিং এজেন্টদেরকে গ্রেফতার করা, আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখা এবং নির্বাচনের দিন নির্দিষ্ট কেন্দ্রগুলো থেকে পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দেওয়া, ভোটারদেরকে ভোট দানে বাধা দেওয়া ও বেলা ১২ টার মধ্যে কেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সবই ঐ ভয়ংকর নীলনকশার অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়।

 

অনেক অভিজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে ২৯ তারিখ রাতে ফাঁস হওয়া এই নীলনকশা কি ঐক্য ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছেনি? পৌঁছে থাকলে তারা কোন ব্যবস্থা নেয় নি কেন? নির্বাচনের দিন দুপুর বেলার মধ্যেই দিনের আলোর মত পরিষ্কার ফুটে যে আওয়ামী লীগ প্রতিটি কেন্দ্রে মূলত এই পূর্ব পরিকল্পিত চক্রান্তেরই বাস্তবায়ন করে চলেছে। এতকিছুর পরেও কেন্দ্রীয় ভাবে নেতৃবৃন্দরা এই প্রহসনের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত কেন অতি দ্রুত নিতে পারেনি তা নিয়ে জনমনে না না প্রশ্ন ও হতাশা বিরাজ করতে দেখা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here