সুপ্রিমকোর্টের মর্যদা, তাও নাকি আবার ক্ষুন্ন হয়!

0
212

অলিউল্লাহ নোমান
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। শান্তি কমিটির নেতা ছিলেন। জামায়াত সহকারি সেক্রেট্রারি জেনারেল কামারুজ্জামানের আপিল শুনানীতে শান্তি কমিটির নেতা হিসাবে দাবী করেছেন নিজেকে। শান্তি কমিটি ছিল মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সরকারের সৃষ্ট। সরকারের তাবেদারি করার জন্যই এ কমিটি গঠন করা হয়। সুরেন্দ্র কুমার শান্তি কমিটির নেতা ছিলেন নতুন করে জানান দিলেন তিনি নিজেই। এর আগে এ পরিচয়টি কেউ জানত না।
অবসরে যাওয়া বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। যিনি নিজেকে দাবী করেন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে। বিচারক পদে নিয়োগের আগে, নিয়োগ পেয়ে এবং অবসরে গিয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে সক্রিয়।
এই দুই বিচারপতি আপিল বিভাগে এক সাথে যোদ্ধাপরাধ মামলায় যাবজ্জীবন প্রাপ্ত কাদের মোল্লার আপিল শুনানী গ্রহন করেছেন। শুনানী গ্রহন করেছেন আল্লামা সাঈদী এবং কামারুজ্জামানের। তবে দুইজনের বিষয়েই তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন কাদের মোল্লা এবং আল্লামা সাঈদীর পক্ষ থেকে। তাদের যুক্তি ছিল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দাবী হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ফাঁসি। তারা ১৯৯৪ সালে গণআদালতের নামে রাজনৈতিক বিচার বসিয়ে তাঁদের প্রতিকী ফাঁসি দিয়েছে। এখন আবার বিচারকের আসনে বসেছেন। সুতরাং তাদের কাছে ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে না।
সুরেন্দ্র কুমারের বিরুদ্ধে আপত্তির কারন আরো ছিল বেশি স্পষ্ট। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিমকে আপিল বিভাগে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন সুরেন্দ্র কুমার। ৩ডা ফাসি দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয় তাঁকে। তারপরই আপিল বিভাগে নিয়ে আসার কথা বলা হয়। এতে তাঁর অভিপ্রায় ইতোমধ্যে স্কাইপ সংলাপে প্রকাশ পেয়েছে। তাই তাঁর কাছে ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে না। তাদের এই আপত্তি আমলে নেয়া হয়নি। যদি সভ্য দুনিয়ায় কোন বিচারকের বিরুদ্ধে ন্যায় বিচারপ্রাপ্তি নিয়ে কোন পক্ষ শঙ্কা প্রকাশ করলে নিজেরাই সরে দাড়ান। তবে এই দুইজন শুনানী গ্রহনের বিষয়ে ছিলেন সুদৃঢ়। তারা শুনেছেন। রায় দিয়েছেন। রায় লিখেছেন। বিশেষ করে কাদের মোল্লার রায়টি লিখেন শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। আসামীদের শঙ্কার বহি:প্রকাশ ঘটেছে রায়ে। শুধু তাই নয়, বিচারাতি মানিক এখন আবার ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সাথে রাজপথে।
এ দুই বিচারপতি নিজেদের মধ্যে কাইজ্যায় লিপ্ত হয়েছেন। ঝগড়ার বিষয়টি তাদের একান্ত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কাইজ্জা সুপ্রিমকোর্টের গন্ডি পার হয়ে রাজপথে মোড় নিয়েছে। গত সোমবার সুপ্রিমকোর্ট মাজার গেটের বাইরে দাড়িয়ে রাজপথে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিাচরপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
দুই বিচারপতির কাইজ্জার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেছেন, শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের আচরণকে সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদা ক্ষুন্ন করছে। তাঁর মুখে সুপ্রিমকোর্টের মার্যাদার কথা শুনে সংবিধান ও আইন লজ্জা পাওয়ার কথা। কারন আইন ও সংবিধানকে রাজনৈতিক চিন্তায় যত রকম বলৎকার করা যায়, সবই প্রয়োগ করার চেস্টা করেছেন মাহবুবে আলম। পদে পদে আইনকে আওয়ামী চিন্তায় প্রভাবিত করতে চাপে রেখেছেন বিচারকদের।
অ্যাটর্নিজেনারেল হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। তবে তিনি নিজেকে একটি দলের ক্যাডার হিসাবেই সুপ্রিমকোর্টে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাজনৈতিক চিন্তাকে সুপ্রিমকোর্টের মাধ্যমে আইনি লেবাস দিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা সুপ্রিমকোর্টে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি শতভাগ সফল। সরকার যে বিষয়ে নিজের চিন্তার আলোকে সুপ্রিমকোর্টের ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করেছেন সেটা আদায় হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মত দৃঢ় রাজনৈতিক চিন্তার মানুষের কারনেই সম্ভব হয়েছে সবকিছু।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষায় সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদার প্রশ্নেই আসা যাক। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গত সোমবার সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদার প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদা বলতে কিছু আছে!! নিচের উদাহরণ গুলো এক নজর দেখে নিতে পারি। তবেই নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখা যাবে। বিচার বিভাগের আসলেই কি কোন মর্যাদা আছে বাংলাদেশে। এর জন্য দায়ী কি সাধারণ মানুষ! নাকি খোদ বিচারক এবং তাদের নিয়োগ কর্তা রাজনীতিকরা?
ঘটনা-১
অ্যাটর্নি জেনারেল যেদিন মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, সেদিন ৩জন বিচারপতি আপিল বিভাগে শপথ নিয়েছেন। এদের মধ্যে ২জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ২৯জনকে ডিঙ্গিয়ে। অর্থাৎ সুপারসিড করা হয়েছে ২৯ জনকে। আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে একজনকে ডিঙ্গিয়ে। হাইকোর্ট বিভাগের তালিকায় যিনি জ্যাষ্ঠতম তাঁকে বার বার ডিঙ্গানো হচ্ছে। এবারো তাঁকে ডিঙ্গানো হয়েছে। তিনি অত্যন্ত ন্যায় পরায়ন বিচারপতি। তাঁর বিচার নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে কারো কোন প্রশ্ন রয়েছে এমনটা শোনা যায় না। অথচ তাঁকেই বারবার ডিঙ্গানো হচ্ছে। আর ২৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে যে দুই জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের একজন চরম বিতর্কিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন নিজামুল হক নাসিম। তিনি ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। প্রকাশিত স্কাইপ স্ক্যান্ডালের নায়ক ছিলেন তিনি। বিচার নিয়ে সরকার, ট্রাইব্যুনাল এবং প্রসিকিউটরদের যৌথ ষড়যন্ত্র প্রকাশ পায় নিজামুল হক নাসিমের মুখে। প্রকাশিত স্কাইপ স্ক্যান্ডালে সবকিছু উঠে এসেছে। স্কাইপ স্ক্যান্ডাল প্রকাশের পর নিজামুল হক নাসিম ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। একটি অসদারচরণের কারনে ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করা ব্যক্তিটি হাইকোর্ট বিভাগে রয়ে যান বহাল তবিয়তে। তাঁকে এখন আবার ২৯জনকে ডিঙ্গিয়ে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এতে কি বিচার বিভাগের মর্যাদা খুব উচুতে উঠছে? যাদের ডিঙ্গানো হয়েছে তাদের কোনই মর্যাদা নাই তাইলে! বা তারা কি সৎ, ন্যায়পরায়ন বা যোগ্য বিচারক নন! হাইকোর্ট বিভাগের জ্যাষ্ঠতম যাতে বারবার ডিঙ্গানো হচ্ছে তাঁর অপরাধ কি! সেটা কি তাঁর মর্যাদাকে আঘাত করছে না! একজন বিচারপতির মর্যাদায় আঘাত করা কি বিচার বিভাগের মর্যাদায় স্পর্শ করে না! তারা আসলে সরকারের অনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাই বারবার সুপারসিড হচ্ছেন।
ঘটনা-২
২০১০ সালে সরকার ঢালাওভাবে মানুষকে গ্রেফতার এবং হয়রানি করছিল সরকার। হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চ থেকে জামিনও পাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর থেকে কারাগারে ফোন করা হতো। হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জামিনের আদেশ কারাগারে পৌছালেও মুক্তি মিলত না তাদের। কারন অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর থেকে ফোন করা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ বা রায়ের চেয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল দফতরের টেলিফোনের গুরুত্ব বেশি কারা কতৃপক্ষের কাছে। তাই টেলিফোনে মুক্তি পাওয়া আটকে যায় হাইকোর্টে জামিনপ্রাপ্তদের। এরকম ৩শত উদাহরণ টেনে ২০১০ সালের মার্চ মাসে একটি সংবাদ প্রকাশ করে দৈনিক আমার দেশ। এর কিছুদিন পর এপ্রিলে আরেকটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়-‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে। এতে উঠে আসে অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতের যৌথ ষড়যন্ত্রের কিছু চিত্র। সেই সংবাদের পর আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়। মামলাটির শুনানীতে সব প্রমানপত্র উপস্থাপন করা হয় বিচারপতিদের সামনে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ৬জন বিচারপতি ছিলেন শুনানী গ্রহনে। প্রমানপত্র গুলো হাতে পেয়ে তাঁরা বলেছিলেন-ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। বিচার বিভাগ নিজেদের দলীয় আনুগত্যের বিষয়টি ঢাকতে ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’ বলে নিজেরা ডিফেন্স নিয়েছিলেন সেদিন। প্রশ্ন হচ্ছে এটা কি বিচার বিভাগের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি!
ঘটনা-৩
২০১০ সালের মার্চ মাসে হাইকোর্ট বিভাগে কয়েকজন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হল। এই নিয়োগ প্রাপ্তদের মধ্যে একজন ছিলেন চলমান খুনের মামলার প্রধান আসামী। আরো ছিলেন সুপ্রিমকোর্টে সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি। তাদের বিষয়ে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় সবিস্তার সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম লজ্জায় ২জনকে শপথ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। টানা ৬ মাস তারা লোক চক্ষুর আড়ালে ছিলেন। শপথহীন অবস্থায় এক রকম আত্মগোপনে কাটিয়েছেন টানা ৬ মাস। ফজলুল করিম অবসরের পর প্রধান বিচারপতি হলেন খায়রুল হক। তিনি প্রধান বিচারপতির আসনে বসেই তাদের শপথ দিলেন। নি¤œ আদালতে চলমান খুনের মামলার প্রধান আসামী ও সুপ্রিমকোর্টে সন্ত্রাসে জড়িত ব্যক্তিকে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ এবং শপথ পাঠ করানো কি বিচার বিভাগের মর্যাদকে উচুঁতে নিয়েছে!!
ঘটনা৪
২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর। ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত¦বাধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম এ জলিল, জাতীয় পার্টির বর্তমান কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও হাসানুল হক ইনু সম্মিলিতভাবে একটি রীট আবেদন করেন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকার বৈধতা নিয়ে ছিল এ রীট। এটি’র শুনানী চলছিল একটি বেঞ্চে সেদিন। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী মনে করেছিলেন ন্যায় বিচার পাবেন না। তাই মধ্যাহ্ন বিরতিতে তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিত আবেদন করলেন। ন্যায় বিচার না পাওয়ার শঙ্কা নিয়ে আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানী স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। এই আদেশ সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে এসে পৌছালে শুরু তান্ডব। এই তান্ডবে অংশ নিয়েছিলেন আজকের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ তৎকালীন বার সভাপতি রোকন উদ্দিন মাহমুদ। সুপ্রিমকোর্টে অগ্নি সংযোগ করা হল। বিচার চলাকালীন হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন দরজায় লাথি মারা হল। ভাংচুর করা হল প্রধান বিচারপতির এজলাস। প্রধান বিচারপতির চেয়ার উল্টে ফেলে দেয়া হল নীচে। এতে কি বিচার বিভাগের মর্যাদাকে উন্নত করেছিলেন সেদিন! এই সন্ত্রাসের ধারাবাহিকতায় সুরেন্দ্র কুমার আজকে প্রধান বিচারপতি এবং শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক আপিল বিভাগে নিয়োগ পেয়ে অবসরে।
ঘটনা-৫
হাইকোর্ট বিভাগে শেখ হাসিনা সরকার অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি এককালে যশোর জেলা জজ আদালতে ওকালতি করছিলেন। বিয়ে করেন যশোরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। কিন্তু বাসর রাতেই এ বিয়ে ভেঙ্গে যায়। কারন ছিল, মোয়াজ্জেম হোসেন সৎ বোনের সাথে প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত। বিয়ের রাতেই বিষয়টি প্রকাশ পায় নববধুর সমানে। বাসর রাতেই বিয়ে শেষ। সকালে নববধু চলে যান বাপের বাড়িতে। আর ফেরত আসেননি। এই বিয়ের ঘটক ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের একজন প্রবীন আইনজীবী। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সমিতির এ্যানেক্স ভবনের চার তলায় তিনি বসেন।
দ্বিতীয় দফায় আবার বিয়ে করলেন তিনি। সেই বিয়ের পরও স্ত্রীর কাছে একই ঘটনা প্রকাশ পায়। সৎবোনের সাথে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক দেখার পর দ্বিতীয় স্ত্রীও আর থাকেননি। সংসার ভেঙ্গে যায়। দ্বিতীয় স্ত্রী’র দায়ের করা মামলায় তিনি কারাগারে যান। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের এরশাদ যামানায় যশোর কারাগারে ছিলেন বেশি কিছুদিন। এসব কারনে সৎবোনের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ পায় যশোর জেলা ও দায়রা আদালতের আইনজীবীদের মাঝে। এতে আইনজীবীরা তাঁকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। তিনি নিজেকে চক্ষুলজ্জা থেকে রক্ষা করতে চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে তিনি বিয়ে করেন চাপাইনবাবগঞ্জের একজন মহিলাকে। এ মহিলা ছিলেন ঢাকায় ইডেন কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক। ২০১০ সালে তিনি ইডেন কলেজ থেকে কবি নজরুল কলেজে বদলী হয়েছিলেন।
তৃতীয় বিয়ের পরও সৎবোনের সাথে তাঁর সম্পর্ক বহাল থাকে। সৎবোধ যশোর থেকে ঢাকায় চলে আসে। এক পর্যায়ে কলেজ শিক্ষিকা তৃতীয় স্ত্রী’র চোখে বিষয়টি ধরা পড়ে। শুরু হয় সংসারে অশান্তি। তৃতীয় স্ত্রী বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রে আবেদন জানান। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে এগিয়ে যান সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান ও বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস বাবু। তাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। দুই জনের বিয়ে বিচ্ছেদ হয় তখন। এই স্ত্রী’র ঘরে ২ কণ্যা সন্ত্রানও রয়েছে মোয়াজ্জেম হোসেনের।
হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর ঘটনার সত্যতা যাছাই করতে ইডেন মহিলা কলেজে যোগাযোগ করা হয় দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে। সেখানে সরেজমিনে গিয়ে বাংলা বিভাগের ওই শিক্ষিকার খোজ করা হয়। তখন অন্য শিক্ষকরা জানতে চান কেন তাঁকে খোজ হচ্ছে। জানানো হয়, স্বামী হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হয়েছেন। তাই প্রতিক্রিয়া নিতে এসেছি। তখন উপস্থিত শিক্ষক শিক্ষিকা সবাই ছি ছি করে উঠেন। তারা বলেন, এই রকম চরিত্রের লোক বিচারপতি হলে দেশ আর থাকবে না। দেশ ধ্বংসের আলামত হচ্ছে এটা। ওই মহিলা ইডেন কলেজের একটি ছাত্রী হলেরও প্রভোষ্ট ছিলেন। ততদিনে শিক্ষিকা ইডেন কলেজ থেকে বদলী হয়ে ঢাকায় সরকারি কবি নজরুল কলেজে যোগ দেন। তিনি আজিমপুরে সরকারি অফিসারদের আবাসিক কলোনিতে থাকেন দুই কন্যা সন্তান নিয়ে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, মোয়াজ্জেম হোসেন শেষ পর্যন্ত সৎ বোন কোহিনুরের সাথেই লিভ টুগেদার করছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে এতে কি বিচার বিভাগের মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে!!!
ঘটনা-৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ শুনানী চলছে। একজন মাত্র সাক্ষীর বিতর্কিত ৩টি পৃথক জবানবন্দিতে ছিল ৩ রকমের বর্ণনা। এই বিতর্কিত ৩টি জবানবন্দির কোনটি সত্য বলিয়া ধরে নেয়া হবে! এবং এর মাপকাটি কি হবে! এনিয়ে প্রশ্ন রেখেছিলেন কাদের মোল্লার আইনজীবী। বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার উত্তর দিলেন-আমাদের একটা বিশ্বাস হয়েছে, তাই ফাঁসির আদেশ দিয়েছি। এরকম বিতর্কিত সাক্ষীর ৩ বক্তব্যের যেটি ফাঁসি দিতে সুবিধা তা গ্রহন করা এবং দাম্ভিকতার সাথে বলা কি বিচার বিভাগের মর্যাদাকে উন্নত করে!!

ঘটনা-৭
বিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিয়ে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। এই মামলার আপিল শুনানীর জন্য ধার্য্য তারিখে খালেদা জিয়া আরো একটি আবেদন করেছিলেন। এই আবেদনের শুনানীর সুযোগ না দিয়ে বা কোন শুনানী না করে আপিল খারিজ করে দেয়া কি ন্যায় বিচার হয়েছে? এতে কি আদালতের মর্যাদা উচুতে উঠেছে!!! বেগম খালেদা জিয়া ন্যায় বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে বিচারকদের উপর আনাস্থা জ্ঞাপন করেছিলেন। লিখিত এই অনাস্থা জ্ঞাপনের পিটিশনটি সেদিন উত্থাপন করার সুযোগ-ই দেয়া হয়নি। বিচারপ্রার্থীর কথা না শুনে গায়ের জোরে আদেশ দেয়া কি বিচার বিভাগের মর্যাদাকে উন্নত করে!

ঘটনা-৮
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রিভিউ শুনানীর আগে পাকিস্তানের ৫ বিশিষ্ট নাগরিক সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। যাদের মধ্যে একজন ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান। তারা বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টে এসে সাক্ষ্য দিতে চাইলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জমা দেয়া হল। তাদের সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি না দিয়ে এবং জমা দেয়া সনদ যাছাই না করেই খারিজ করে দেয়া হল। সনদের বিষয়টি যাছাই না করেই নিষ্পত্তি ছাড়াই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে হত্যা করার হুকুম দেয়া হল। তা কি আদালতের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করেনি!!!
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। যা আদালতের মর্যাদা বিচারকরা নিজেরাই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। অথচ এসব করা হয় অ্যাটর্নি জেনারেলের প্ররোচনায়। তিনি সরকার পক্ষে আদেশ নিতে কখনো কখনো আদালতে মাস্তানের ভুমিকায় অবতীর্ন হতে দেখা যায়। অনেক বিচারপতি তাঁকে দেখলেই ভয়ে থাকেন। এখন তাঁর মুখেই আবার আদালতের মর্যাদার কথা শোনা যায়।
লেখকÑদৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।